'ইনসাফহীন রাষ্ট্র ও বিভক্ত রাজনীতি একজন হাদির স্বপ্ন'
মোঃ আল এমরান
সম্পাদক ও প্রকাশক
মাসিক নব জ্যোতি।
এই দেশে কি আদৌ ইনসাফ কায়েম হবে, প্রশ্নটি আজ আর কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে অভিযোগ নয়, এটি হয়ে উঠেছে সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের জমে থাকা বেদনা, ক্ষোভ আর হতাশার ভাষা।
শহরের ফুটপাতের শ্রমিক থেকে শুরু করে গ্রামের কৃষক, বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ থেকে শুরু করে গৃহস্থ নারী সবাই কোনো না কোনোভাবে এই প্রশ্নটি নিজের ভেতরে বহন করছে।
চলমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে গঠিত কথিত জোট মানুষের মধ্যে একটি নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিয়েছিল। বিশেষ করে ইসলামপন্থী দলগুলোর একটি সম্মিলিত অবস্থান বহু মানুষের কাছে বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছিল।
অনেকে মনে করেছিলেন, দীর্ঘদিনের শোষণ ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে হয়তো এবার একটি নৈতিক ও ইনসাফভিত্তিক রাজনীতির উত্থান ঘটবে। কিন্তু সেই আশার ভিত খুব দ্রুতই কেঁপে ওঠে।
জোট থেকে বেরিয়ে এক দল একক নির্বাচনের ঘোষণা দেয়। এই সিদ্ধান্ত সাধারণ একজন ইসলামপন্থি মানুষের কাছে যেমন বিস্ময়কর, তেমনি হতাশাজনক। কেন তারা এই পথ বেছে নিল তা নিয়ে নানা প্রশ্ন, নানা গুঞ্জন, নানা বিশ্লেষণ ঘুরে বেড়াচ্ছে রাজনীতির অন্দরমহলে।
ইসলামী দলের রাজনৈতিক কর্মীরা মনে করেন,এর পেছনে রয়েছে গভীর ষড়যন্ত্র বা রাজনৈতিক কৌশলগত চাপ, হয়ত এককভাবে নির্বাচন করার সক্ষমতার স্বপ্ন দেখানো হয়েছে এমনভাবে, যেন ভেতরের মেকানিজম কেউ সহজে বুঝতে না পারে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে অর্থ, ক্ষমতা ও প্রভাবের এই অদৃশ্য খেলা নতুন কিছু নয়। ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে, যেখানে আদর্শ দুর্বল হয়, সেখানে অর্থই হয়ে ওঠে নিয়ামক শক্তি। বাস্তব সত্য হলো, ইসলামপন্থী শক্তিগুলো বিভক্ত হলে তাদের ভোট কমে যায়, প্রভাব ক্ষীণ হয়। আর সেই সুযোগ কাজে লাগায় পুরোনো বুর্জোয়া আধিপত্যবাদী শক্তিগুলো।
জাতীয় রাজনীতির পর্দার আড়ালে যে কত স্তরের মেকানিজম কাজ করে,তা সাধারণ মানুষের কল্পনারও বাইরের। বাংলাদেশের মানুষ মূলত ধর্মপ্রাণ। ফলে ইসলামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে ‘শরিয়া আইন’ শব্দটি স্বাভাবিকভাবেই যুক্ত হয়ে যায়।
অনেকেই মনে করেন, ইসলামপন্থী দল ক্ষমতায় এলে রাতারাতি শরিয়া আইন জারি হবে। কিন্তু এই ধারণা বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সঙ্গতিপূর্ণ নয়।
বাস্তবে যা হওয়ার কথা, তা হলো চলমান আইন কাঠামোর ভেতরে কোরআন ও হাদিসের আলোকে কিছু সংস্কার, কিছু নতুন আইন প্রণয়ন।
কারণ বর্তমান আইন ব্যবস্থা মূলত ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের উত্তরাধিকার। এই কাঠামোর সঙ্গে বাংলাদেশের সামাজিক, নৈতিক ও ধর্মীয় বাস্তবতার মৌলিক অসংগতি রয়েছে।
৫৫ বছরের রাষ্ট্রীয় ইতিহাসেও আমরা কোনো স্বতন্ত্র ও ন্যায়ভিত্তিক শাসন কাঠামো গড়ে তুলতে পারিনি। বরং একের পর এক সরকার সেই পুরোনো কাঠামোকেই নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করেছে।
ফলে আইন হয়েছে শক্তিশালীর হাতিয়ার, দুর্বলের আশ্রয় নয়। এর ফল আজ স্পষ্ট এই রাষ্ট্র কেবল কিছু নির্দিষ্ট সুবিধাভোগী শ্রেণির সম্পত্তিতে পরিণত হয়েছে। রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতা, ক্ষমতাধর আমলা ও উচ্চপর্যায়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তারাই রাষ্ট্রের মূল সুবিধাভোগী।
সাধারণ মানুষ তিলে তিলে নিঃশেষ হচ্ছে অর্থনৈতিকভাবে, সামাজিকভাবে, এমনকি নৈতিকভাবেও।জুলাই পরবর্তী সময়ে দেশের মানুষের মধ্যে যে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা জেগে উঠেছিল,তা ছিল ব্যতিক্রমী।
তরুণরা নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির স্বপ্ন দেখেছিল, নারীরা নিরাপত্তা ও মর্যাদার কথা বলেছিল, শ্রমজীবী মানুষ ন্যায্য মজুরি ও সম্মানের দাবি তুলেছিল। এক ধরনের সামাজিক জাগরণ দৃশ্যমান হয়েছিল।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই সেন্টিমেন্ট নিভে গেছে। মানুষ আবারও বুঝেছে কোনো দলকেই নিঃশর্তভাবে বিশ্বাস করা যায় না। দলগুলোর ভেতরেই ডান-বাম, উগ্র-মধ্যপন্থী নানা গোষ্ঠী নিজেদের স্বার্থে কাজ করে যাচ্ছে। প্রত্যেকে নিজের আদর্শকে চূড়ান্ত সত্য মনে করে, কিন্তু নিজের ভুল স্বীকার করার সংস্কৃতি নেই।
ক্ষমা চাওয়ার রাজনীতি এই দেশে অনুপস্থিত। ভুল হলে সংশোধনের পরিবর্তে চলে দায় এড়ানোর প্রতিযোগিতা। আর সেই শূন্যস্থানেই জন্ম নেয় হতাশা ও রাজনৈতিক অনীহা।
এই রাজনৈতিক অন্ধকার সময়ে হাদি একটি ব্যতিক্রমী নাম। তিনি কোনো অলৌকিক চরিত্র নন, আবার নিছক দলীয় মুখপাত্রও নন। হাদি মূলত একটি সময়ের প্রতীক, একটি প্রজন্মের দিক পাল ও স্বপ্নের প্রতিফলন।
ইনসাফভিত্তিক সমাজ, নৈতিক রাষ্ট্রব্যবস্থা ও শোষণহীন বাংলাদেশ গড়ার যে ভাবনা তিনি সামনে এনেছিলেন, তা সাধারণ মানুষের গভীর অনুভূতির সঙ্গে মিলে যায়। হাদি বুঝেছিলেন সমস্যা কেবল ক্ষমতার পরিবর্তনে নয়, সমস্যার শেকড় রাষ্ট্রের দর্শনে।
তিনি বারবার বলেছেন, ঔপনিবেশিক শাসন কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে ইনসাফ কায়েম করা যায় না।
কিন্তু এখানেই হাদির ‘অপরাধ’। তিনি কর্পোরোট পৃষ্ঠপোষকতার রাজনীতি করেননি, ক্ষমতার অলিগলি দিয়ে চলেননি। ফলে তিনি হয়ে ওঠেন বুর্জোয়া আধিপত্যবাদী শক্তির জন্য এক অস্বস্তিকর নাম।
কারণ ইনসাফের কথা বললে সবচেয়ে বেশি ভয় পায় তারাই, যারা অন্যায়ের ওপর দাঁড়িয়ে নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করে। হাদির বিরুদ্ধে কখনো চরিত্র হননের চেষ্টা হয়েছে, কখনো রাজনৈতিকভাবে এক ঘরে করার কৌশল নেওয়া হয়েছে, আবার কখনো নীরব দমন।
কিন্তু ইতিহাস বলে, ইনসাফের পথে হাঁটা মানুষদের পথ কখনো মসৃণ হয় না। হাদি সেই ধারারই একজন, যিনি জানতেন ন্যায়ের রাজনীতি করতে গেলে জুলুম অবধারিত। আজ কেউ তাকে অতিরঞ্জিত ভাবুক বলে, কেউ বিপজ্জনক আদর্শবাদী বলে চিহ্নিত করতে চায়।
কিন্তু সাধারণ মানুষ তাকে দেখে ভিন্ন চোখে একজন মানুষ হিসেবে, যিনি ক্ষমতার চেয়ারে বসার আগে বিবেকের চেয়ারে বসতে চেয়েছেন।
ব্যক্তি বা দল যাই হোক, রাষ্ট্র যদি ন্যায়বিচারের জায়গায় দাঁড়াতে না পারে, তবে সেই রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তিই প্রশ্নবিদ্ধ হয়। বুর্জোয়া আধিপত্যবাদী কাঠামো শেষ পর্যন্ত কাউকেই রেহাই দেয় না এটাই ইতিহাসের নির্মম সত্য।
আজকের বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এই রাষ্ট্র আসলে কার জন্য, শিক্ষিত না অশিক্ষিত, নারী না পুরুষ, তরুণ না প্রবীণ সবাই কোনো না কোনোভাবে বঞ্চিত। ধর্মীয় ও রাজনৈতিক বিভাজন মানুষকে আরও দুর্বল করেছে। অথচ ইনসাফের সমাজ মানে বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা।
যতদিন রাজনীতি মানুষের কল্যাণ নয়, ক্ষমতার খেলা হিসেবেই চলবে, ততদিন ইনসাফ কেবল বক্তৃতায় থাকবে, বাস্তবে নয়। এই দেশে ইনসাফ কায়েম হবে কি না তা নির্ভর করে দল নয়, মানুষের বিবেক জাগ্রত হওয়ার ওপর।
ইনসাফ কোনো দলের সম্পত্তি নয়,ইনসাফ একটি জাতির নৈতিক অধিকার। আর হাদির মতো মানুষরা ইতিহাসে তাই বারবার ফিরে আসে পরাজিত হয়ে নয়,
বরং অবিচারের অন্ধকার চিরে ন্যায়বোধের আলো জ্বালাতে। ক্ষমতার মসনদ নয়, মানুষের বিবেকেই তাদের প্রকৃত বিজয় রচিত হয়।
Comments (0)
Be the first to comment on this article.
Leave a comment